রুডলফ স্যান্টোবেলো বনাম নিউ ইয়র্ক রাজ্য
সাইটেশন : 404 U.S. 257 (1971)
জুরিসডিকশন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
আপিলকারী : রুডলফ স্যান্টোবেলো
বিবাদী : নিউ ইয়র্ক রাজ্য
ঘটনা :
আবেদনকারীর বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে নিউইয়র্কে দুটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগ দুটি ছিল প্রত্যক্ষভাবে জুয়া পরিচালনায় উৎসাহ প্রদান এবং জুয়া-সংক্রান্ত নথিপত্র দখলে রাখা। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পর, একজন সহকারী জেলা অ্যাটর্নি আবেদনকারীকে তুলনামূলকভাবে লঘুতর অপরাধ, অর্থাৎ পরোক্ষভাবে জুয়া-সংক্রান্ত নথিপত্র দখলে রাখার অভিযোগে দোষ স্বীকার করার সুযোগ দিতে সম্মত হন। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। তবে শর্ত ছিল যে, রাষ্ট্রপক্ষ সাজা নির্ধারণের সময় কোনো নির্দিষ্ট সাজা প্রদানের সুপারিশ করবে না। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুন আবেদনকারী বিচারিক আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেন। দণ্ড প্রদানের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন না থাকায় কয়েক মাসের জন্য সাজা ঘোষণার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যে আবেদনকারী নতুন আইনজীবী নিয়োগ করেন। নতুন আইনজীবী যথাক্রমে দোষ স্বীকারের আবেদন প্রত্যাহার, কথিত অবৈধ তল্লাশির মাধ্যমে সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ বাতিল এবং গ্র্যান্ড জুরির কার্যবিবরণী পরিদর্শনের অনুমতি চেয়ে একাধিক আবেদন দাখিল করেন। ১৯৬৯ সালের ২৬ নভেম্বর আদালত এসব আবেদন প্রত্যাখ্যান করার পর, প্রাথমিক বিচারকের অবসরে যাওয়ার কারণে নতুন একজন বিচারকের সামনে ১৯৭০ সালের ৯ জানুয়ারি সাজা নির্ধারণের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
সাজা নির্ধারণের শুনানির সময়, রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় আইনজীবী, যিনি পূর্ববর্তী দোষ স্বীকারের সমঝোতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, তিনি আবেদনকারীকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড প্রদানের সুপারিশ করেন। তিনি আবেদনকারীর অপরাধমূলক অতীত এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের সঙ্গে তাঁর কথিত সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে এই সুপারিশ করেন। আসামীপক্ষের আইনজীবী তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানান এবং রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতির বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। তিনি ওই সমঝোতার অস্তিত্বের প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ চেয়ে শুনানি মুলতবির আবেদন করেন। দ্বিতীয় প্রসিকিউটর যুক্তি দেন যে, আদালতের নথিতে এমন কোনো প্রতিশ্রুতির অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। তবে পরবর্তী কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষ এই বিষয়টি অস্বীকার করেনি যে, প্রকৃতপক্ষে এমন একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সাজা নির্ধারণকারী বিচারক শুনানি মুলতবি করতে কিংবা সাক্ষ্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন যে, রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি। বরং, আবেদনকারীকে পুনরাবৃত্ত অপরাধকারী, পেশাদার অপরাধী হিসেবে বর্ণনা করা একটি প্রবেশন প্রতিবেদন (Probation Report)-এর ওপর নির্ভর করে আদালত সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। নিউইয়র্ক সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, ফার্স্ট ডিপার্টমেন্ট, সর্বসম্মতিক্রমে উক্ত দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। পরবর্তীতে নিউইয়র্ক কোর্ট অব আপিলস -এ আপিলের অনুমতিও প্রত্যাখ্যান করা হয়।
ইস্যু :
১. দোষ স্বীকারের আবেদন (Plea Negotiations) নিয়ে আলোচনার সময় সাজা প্রদানের সুপারিশ সম্পর্কিত রাষ্ট্রপক্ষের কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হলে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে উক্ত দোষ স্বীকারের আবেদন বা পরবর্তীতে প্রদত্ত সাজা অবৈধ হয়ে যায় কি না।
২. রাষ্ট্রপক্ষ দোষ স্বীকারের সমঝোতা ভঙ্গ করলেও, সাজা প্রদানকারী বিচারক যদি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, রাষ্ট্রপক্ষের সুপারিশ তাঁর সাজা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি, সে ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে আইনি প্রতিকার প্রদান করা আবশ্যক কি না।
যুক্তিতর্ক :
আপিলকারী পক্ষের যুক্তি :
আপিলকারী পক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, সহকারী জেলা অ্যাটর্নি কর্তৃক প্রদত্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তিনি দোষ স্বীকার করতে সম্মত হয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতিটি ছিল যে, রাষ্ট্র পক্ষ সাজা নির্ধারণের সময় কোনো নির্দিষ্ট সাজা প্রদানের সুপারিশ করবে না। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, দ্বিতীয় প্রসিকিউটর কর্তৃক সর্বোচ্চ সাজা প্রদানের সুপারিশ করা দোষ স্বীকারের সমঝোতার সরাসরি লঙ্ঘন। যেখানে তার দোষ স্বীকারের আবেদন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল না এবং তার যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারও লঙ্ঘিত হয়েছে। আপিলকারীর আইনজীবী রাষ্ট্রপক্ষের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সাজা নির্ধারণের শুনানি মুলতবির আবেদন জানান। একই সঙ্গে, রায় ও দণ্ডাদেশ বাতিল করার আবেদন করেন, যাতে আবেদনকারীকে তাঁর দোষ স্বীকারের আবেদন প্রত্যাহারের সুযোগ প্রদান করা হয়।
বিবাদী পক্ষের যুক্তি :
সাজা নির্ধারণের শুনানির সময় দ্বিতীয় প্রসিকিউটর যুক্তি দেন যে, আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী সাজা প্রদানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি, এমন অভিযোগের সমর্থনে আদালতের সামনে কোনো নথি বা লিখিত প্রমাণ নেই। পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষ স্বীকার করে যে, প্রকৃতপক্ষে এমন একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনা মামলার ফলাফলের ওপর কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেনি। রাষ্ট্রপক্ষ আরও যুক্তি দেয় যে, সাজা প্রদানকারী বিচারক স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপক্ষের সুপারিশ তাঁর সিদ্ধান্তে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করেনি এবং সাজা নির্ধারণের ফলাফলকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করেনি। সুতরাং, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনাটি একটি ‘অহিংস বিচারিক ত্রুটি’ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। এ কারণে দোষী সাব্যস্ত করার রায় বাতিল করা বা নতুন করে বিচার পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
সিদ্ধান্ত :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট- আপিল বিভাগের রায় বাতিল করে মামলাটি অধিকতর বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের আদালতে পুনরায় প্রেরণ করেন। আদালত রায় দেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ একটি একক ও সমন্বিত প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, রাষ্ট্রপক্ষের কার্যালয়ের অভ্যন্তরে যোগাযোগের ঘাটতির কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেও, সেই ব্যর্থতা এমন একটি চুক্তি বা সমঝোতা ভঙ্গের অজুহাত হতে পারে না, যার ভিত্তিতে আসামি দোষ স্বীকার করতে সম্মত হয়েছিলেন। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারণ করেন যে, বিচারিক আদালতের বিচারক প্রসিকিউটরের সুপারিশ – সাজা নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলেনি বলে উল্লেখ করলেও আবেদনকারীকে আইনি প্রতিকার প্রদান করতে হবে। কারণ, যথাযথ কার্যপদ্ধতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার সম্পূর্ণ দায়ভার রাষ্ট্রপক্ষের ওপর বর্তায়।
এই লঙ্ঘনের প্রতিকার নির্ধারণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের আদালতের বিবেচনাধিকার-এর ওপর নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। অঙ্গরাজ্যের আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, মামলার পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হবে, দোষ স্বীকারের সমঝোতা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন কি না। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে ভিন্ন একজন বিচারকের সামনে পুনরায় সাজা নির্ধারণের জন্য হাজির করতে হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষ কোনো সাজা প্রদানের সুপারিশ করতে পারবে না। অপরদিকে, আদালত বিবেচনা করতে পারেন যে, আবেদনকারীকে তাঁর পূর্ববর্তী দোষ স্বীকারের আবেদন সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করার এবং নতুন করে মূল অভিযোগপত্রে উল্লিখিত দুটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগে দোষ স্বীকার করা বা নিজের পক্ষে বিচার দাবি করার সুযোগ দেওয়া উচিত কি না।
সংশ্লিষ্ট আইনি নীতি :
দোষ স্বীকারের সমঝোতার আইনগত বাধ্যবাধকতা: যখন কোনো আসামির দোষ স্বীকারের সিদ্ধান্ত প্রসিকিউশন পক্ষের প্রদত্ত কোনো প্রতিশ্রুতি বা সম্পাদিত সমঝোতার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হয় এবং সেই প্রতিশ্রুতি বা সমঝোতা দোষ স্বীকারে সম্মত হওয়ার অন্যতম প্রণোদনা বা বিনিময়মূলক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, তখন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার (Due Process of Law) দাবি অনুযায়ী প্রসিকিউশন পক্ষকে অবশ্যই সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে।
অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান
[সতর্কতা : উক্ত মামলার বাংলা সংস্করণটি মূল ইংরেজি হতে অনূদিত। অর্থগত সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কোনো প্রকার অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হলে, মূল ইংরেজি সংস্করণ প্রাধান্য পাবে।]
নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ
One thought on “স্যান্টোবেলো বনাম নিউ ইয়র্ক (১৯৭১)”
Comments are closed.