শেঙ্ক বনাম যুক্তরাষ্ট্র
সাইটেশন : 249 U.S. 47 (1919)
জুরিসডিকশন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
আপিলকারী : চার্লস শেঙ্ক
বিবাদী : যুক্তরাষ্ট্র
ঘটনা :
বিবাদী (নিম্ন আদালতে) চার্লস শেঙ্ক এবং এলিজাবেথ বেয়ার “সোশ্যালিস্ট পার্টি” নামে একটি সংগঠনের নেতা ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর জন্য লোক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে চালু করা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (military draft) কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করার কারণে এস্পিওনাজ অ্যাক্ট, ১৯১৭ এর অধীনে তারা দোষী সাব্যস্ত হন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং সরকার সেনাবাহিনী গঠনের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের কার্যক্রম চালাচ্ছিলো। শেঙ্ক ও বেয়ার প্রায় ১৫,০০০ থেকে ১৬,০০০টি উক্ত নিয়োগ বিরোধী প্রচারপত্র (leaflet) ছাপিয়ে সেগুলো সরাসরি সেই সব ব্যক্তির কাছে ডাকযোগে পাঠায় যাদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিলো। লিফলেটগুলোতে বলা হয়েছিলো যে, সামরিক নিয়োগটি অবৈধ। এতে সৈন্যদের অপরাধীদের সঙ্গে তুলনা করা হয় এবং তাদের নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে ও সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে বলা হয়। অভিযুক্তরা এই কাজটি করেছিলেন তা প্রমাণ করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সোশ্যালিস্ট পার্টির কার্যালয়ে পুলিশের তল্লাশির সময় পাওয়া বিভিন্ন নথি উপস্থাপন করে। এসব নথির মধ্যে সভায় গৃহীত নোট ও সিদ্ধান্ত ছিলো, যেখানে দেখা যায় যে পার্টি থেকেই প্রচারপত্রগুলো ছাপিয়ে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। এছাড়া, শেঙ্ককে প্রচারপত্রগুলো ডাকযোগে পাঠানোর জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছিলো বলেও নথি থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়।
ইস্যু :
১. লিফলেট বিতরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া আসামীগণ সংবিধানের ১ম সংশোধনীর অধীনে প্রদেয় বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার আলোকে সুরক্ষা পায় কি না।
২. সংবিধানের ৪র্থ ও ৫ম সংশোধনীর অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের বিরুদ্ধে জারি করা বৈধ সার্চ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে জব্দ করা নথিপত্র ফৌজদারি বিচারকার্যে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি না।
৩. Espionage Act-এ ব্যবহৃত “Recruiting” শব্দটি কি শুধু স্বেচ্ছায় সামরিক বাহিনীতে যোগদানের জন্য লোক সংগ্রহকে বোঝায়, নাকি বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের মাধ্যমে লোক সংগ্রহকেও এর অন্তর্ভুক্ত করে।
৪. আসামিরা ব্যক্তিগতভাবে অপরাধমূলক লিফলেট বিতরণ ও ডাকযোগে পাঠানোর ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন এটি প্রমাণের জন্য উত্থাপিত প্রমাণাদি যথেষ্ট ছিলো কি না।
যুক্তিতর্ক :
আপিলকারী পক্ষের যুক্তি :
আসামিরা যুক্তি দেন যে, তাদের দোষী সাব্যস্ত করা অসাংবিধানিক, কারণ ১ম সংশোধনী কংগ্রেসকে এমন কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয় না যা বাক্স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা-কে খর্ব করে। তারা আরও দাবি করেন যে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রমাণ ৫ম সংশোধনীর অধীনে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। তাদের বক্তব্য ছিল, Search Warrant-এর মাধ্যমে জব্দ করা নথিপত্র ব্যবহার করার ফলে তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা self-incrimination (নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা)-এর বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষার পরিপন্থি। সবশেষে, তারা যুক্তি দেন যে, শেঙ্ক ব্যক্তিগতভাবে প্রচারপত্রগুলো ডাকযোগে পাঠানোর জন্য দায়ী ছিলেন বা আসামিরা বাস্তবে কোনো ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না।
বিবাদী পক্ষের যুক্তি (:
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, প্রচারপত্রগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সময়ে বিতরণ করা হয়েছিলো, যাতে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা Selective Service Act-এর অধীনে তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয় বা প্রতিরোধ করে। সরকার আরও যুক্তি দেয় যে বাক্স্বাধীনতা কোনো পরম বা সীমাহীন অধিকার নয়। এর সুরক্ষা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় এমন বক্তব্য, যার উদ্দেশ্য সামরিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা, তা একটি গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ ধরনের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা কংগ্রেসের রয়েছে। এছাড়াও, রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয় যে, জব্দ করা নথিপত্রগুলো প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কারণ, Search Warrant নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং সোশ্যালিস্ট পার্টির কার্যালয়ের বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছিলো। ফলে আসামিদের ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ তল্লাশি বা নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি।
সিদ্ধান্ত :
আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
আদালত জানান, ১ম সংশোধনী এমন বক্তব্যকে সুরক্ষা দেয় না, যা “clear and present danger” সৃষ্টি করে এবং এমন ক্ষতিকর ফলাফল ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করে, যা প্রতিরোধ করার অধিকার কংগ্রেসের রয়েছে। বিচারপতি অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস, আদালতের পক্ষে মতামত প্রদান করে, এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতিটি প্রয়োগ করেন। তিনি বলেন, সাধারণ সময়ে আসামিদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারতো। কিন্তু সক্রিয় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বাক্স্বাধীনতার সাংবিধানিক সীমারেখা পরিবর্তন করে। সামরিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে এমন বক্তব্য যুদ্ধের সময় সহ্য করা যায় না। আদালত প্রমাণ গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে আসামিদের সাংবিধানিক আপত্তিও প্রত্যাখ্যান করেন। আদালতের মতে, সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রধান কার্যালয়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত Search Warrant বৈধ ছিল এবং এটি ৪র্থ অথবা ৫ম সংশোধনীর অধীনে অবৈধ তল্লাশি বা self-incrimination-এর বিরুদ্ধে প্রদত্ত সুরক্ষা লঙ্ঘন করেনি। এছাড়া, আইনের ব্যাখ্যা এবং প্রমাণের যথেষ্টতা সম্পর্কেও আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, “recruiting” শব্দটির অর্থ শুধু স্বেচ্ছায় সামরিক বাহিনীতে যোগদানের জন্য লোক সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক draft-এর মাধ্যমে নতুন লোক সংগ্রহ করাও অন্তর্ভুক্ত। সবশেষে, আদালত মনে করেন যে পার্টির অভ্যন্তরীণ নথিপত্রে থাকা প্রমাণ শেঙ্ক এবং বেয়ার উভয়কেই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য যথেষ্টের চেয়েও বেশি ছিলো। ফলে তাদের দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট আইনি নীতি :
স্পষ্ট ও বর্তমান বিপদ পরীক্ষা: “স্পষ্ট ও বর্তমান বিপদ পরীক্ষা” বলতে বোঝায় যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো নিরঙ্কুশ অধিকার নয়; বরং কোনো বক্তব্যের প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট এবং তা থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য বিপদের মাত্রার ওপর এর সুরক্ষা নির্ভর করে। এই পরীক্ষার প্রয়োগে, কোনো বক্তব্য এমনভাবে ব্যবহৃত হলে যা তাৎক্ষণিকভাবে এমন কোনো অপরাধ (felony) সংঘটিত হওয়ার বা এমন কোনো ক্ষতি সাধনের স্পষ্ট ও বর্তমান বিপদ সৃষ্টি করে, যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কংগ্রেসের রয়েছে, সেক্ষেত্রে সরকার সেই বক্তব্য নিষিদ্ধ বা শাস্তিযোগ্য করতে পারে। এই পরীক্ষা দেখায় যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার ক্ষেত্রে বক্তব্যের প্রেক্ষাপট (context) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি জনাকীর্ণ প্রেক্ষাগৃহে আতঙ্ক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যাভাবে “আগুন” বলে চিৎকার করে, তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা সাধারণত এমন বক্তব্যকে রক্ষা করবে না। একইভাবে, যুদ্ধকালীন সময়ে এমন বক্তব্য, যা দেশের সামরিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে শারীরিক শক্তির কার্যকারিতার মতো প্রত্যক্ষ প্রভাব সৃষ্টি করে, তাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষার আওতায় পড়ে না।
সংশ্লিষ্ট আইন :
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান
- সিলেক্টিভ সার্ভিস অ্যাক্ট, ১৯১৭ (যুক্তরাষ্ট্র)
- এস্পিওনাজ অ্যাক্ট, ১৯১৭ (যুক্তরাষ্ট্র)
অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান
[সতর্কতা : উক্ত মামলার বাংলা সংস্করণটি মূল ইংরেজি হতে অনূদিত। অর্থগত সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কোনো প্রকার অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হলে, মূল ইংরেজি সংস্করণ প্রাধান্য পাবে।]
নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ