জিভোটোওস্কি বনাম জন কেরি  (২০১৫)

Menachem Binyamin Zivotofsky v. John Kerry, Secretary of State

মেনাচেম বেঞ্জামিন জিভোটোওস্কি বনাম জন কেরি, সেক্রেটারি অফ স্টেট

সাইটেশন : 192 L. Ed. 2d 83

জুরিসডিকশন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

আবেদনকারী : মেনাচেম বেঞ্জামিন জিভোটোওস্কি [পক্ষে পিতামাতা এবং অভিভাবক, আরি জেড. এবং নাওমি সিগম্যান জিভোটোওস্কি]
বিবাদী : জন কেরি, সেক্রেটারি অফ স্টেট [পররাষ্ট্রমন্ত্রী]

ঘটনা :

মামলাটি মার্কিন নাগরিক মেনাচেম জিভোটোওস্কিকে কেন্দ্র করে, যিনি ২০০২ সালে জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে মার্কিন কংগ্রেসে ‘বৈদেশিক সম্পর্ক অনুমোদন আইন (২০০২)’-এর ধারা ২১৪(ঘ) পাস হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিগণ জেরুজালেম ইস্যুতে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে আসছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যে ভূমিকা  রেখে আসছিল তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে এই নির্বাহী সিদ্ধান্তটি পরবর্তীতে কংগ্রেসের ধারাবাহিক কিছু আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলস্বরূপ ধারা ২১৪(ঘ) প্রণীত হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, জেরুজালেমে জন্মগ্রহণকারী নাগরিকদের পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে “ইসরায়েল” উল্লেখ করতে হবে। জিভোটোওস্কির অভিভাবক এই মর্মে যুক্তি উত্থাপন করেন যে, কংগ্রেসের পাস করা আইন অনুসারে পাসপোর্টে “ইসরায়েল” লেখা বাধ্যতামূলক এবং পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিষয় দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি এই ক্ষেত্রে কোনো নির্বাহী দায়মুক্তির দাবি করতে পারে না। তবে নির্বাহী বিভাগ সরাসরি তা মানতে অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে, এমনটি করলে যে কোন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করা হবে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”​

ইস্যু :
১. পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে কি কংগ্রেস এবং রাষ্ট্রপতি ভিন্ন ভিন্ন মত দিতে পারে, নাকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ঐক্য বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে?
২. সংবিধানে রাষ্ট্র স্বীকৃতির ক্ষমতা সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও Reception Clause (Art. II, §3) ও Executive Power Clause কি রাষ্ট্রপতিকে কোনো রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদান করে?
৩. যখন রাষ্ট্রপতি কংগ্রেস প্রণীত আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করেন (যাকে ক্ষমতার ‘সর্বনিম্ন স্তর’ বা Lowest Ebb বলা হয়), তখনও কি রাষ্ট্রপতির এমন কিছু ক্ষমতা থাকে যা কংগ্রেস বাতিল করতে পারে না – বিশেষত পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে? (এর মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতিতে কংগ্রেসের ক্ষমতা ও রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্বের মধ্যকার ভারসাম্য যাচাই করা হয়।)

যুক্তিতর্ক :

আবেদনকারী পক্ষের যুক্তি (জিভোটোওস্কি ও কংগ্রেস):
কংগ্রেস যুক্তি প্রদান করে যে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১, ধারা 8 অনুযায়ী নাগরিকত্ব ও প্রাকৃতিকীকরণ বিষয়ে তাদের পূর্ণাঙ্গ (plenary) ক্ষমতা রয়েছে এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথিপত্র কীভাবে উপস্থাপিত হবে তা নির্ধারণ করার এখতিয়ারও কংগ্রেসের। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, পাসপোর্ট মূলত একটি অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দলিল, এবং সেখানে “ইসরায়েল” উল্লেখ করা কোনো কূটনৈতিক স্বীকৃতি নয়; বরং এটি কেবল একটি ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রতিফলন মাত্র। তারা আরও বলেন যে, বৈদেশিক বিষয়ের অজুহাতে রাষ্ট্রপতিকে ধারা ২১৪(ঘ) উপেক্ষা করার সুযোগ দিলে তা নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত বিস্তার (executive overreach) ঘটাতে পারে, যা কংগ্রেসের কর্তৃত্ব এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করবে। আবেদনকারীগণ দাবি করেন যে, ধারা ২১৪(ঘ) নাগরিকদের জন্য একটি “আইনসিদ্ধ অধিকার” (statutory right) সৃষ্টি করেছে, যার মাধ্যমে তারা তাদের জন্মস্থান নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পরিচয় দিতে পারেন। যেমন: তাইওয়ানে জন্মগ্রহণকারী নাগরিকরা “চীন” এর পরিবর্তে “তাইওয়ান” উল্লেখ করতে পারেন।

বিবাদী পক্ষের যুক্তি (নির্বাহী বিভাগ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী):
নির্বাহী বিভাগ এই মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করে যে, Reception Clause এবং Executive Power Clause রাষ্ট্রপতিকে বিদেশি রাষ্ট্রসমূহকে স্বীকৃতি প্রদানের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদান করেছে; এবং পাসপোর্টে সামান্যতম দাপ্তরিক বা প্রশাসনিক সংশোধনও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যার পরিণতিতে সহিংসতা সৃষ্টি বা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাধা প্রদানসহ গুরুতর ও সুদূরপ্রসারী পরিণতি উদ্ভূত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের (নির্বাহী বিভাগ) বক্তব্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় ঐক্য, দ্রুততা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য, যা কেবল নির্বাহী শাখার মাধ্যমেই কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব; পক্ষান্তরে, কংগ্রেসের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো আলোচনা ও বিতর্কনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। এই সকল যুক্তি এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে যে, পররাষ্ট্র বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক বিশেষাধিকার ও ক্ষমতার পরিসর সংবিধানের অধীনে প্রণীত কোনো আইনগত বিধিনিষেধের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ বা খর্ব করা সমীচীন নয়।

সিদ্ধান্ত :

সুপ্রিম কোর্ট ৬–৩ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে রাষ্ট্রপতির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ এ রায় প্রদান করেন যে, Reception Clause ও Executive Power Clause থেকে উদ্ভূত সাংবিধানিক ক্ষমতার ভিত্তিতে বিদেশি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের একচ্ছত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নিকট ন্যস্ত, যা একটি “sole organ” কর্তৃত্ব সৃষ্টি করে। আদালত আরও রায় দেন যে, ধারা ২১৪(ঘ) অসাংবিধানিক, কারণ উক্ত বিধান নির্বাহী বিভাগকে তার নিজস্ব স্বীকৃতি নীতির পরিপন্থি অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করে। আদালত এ বিষয়টিতে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, কংগ্রেস পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগত বিষয়াদি যেমন ফি নির্ধারণ বা জালিয়াতি প্রতিরোধের মতো বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে; তবে কূটনৈতিক বার্তা প্রেরণের মাধ্যম হিসেবে পাসপোর্ট ব্যবহারের ক্ষমতা কংগ্রেসের নেই। এই রায়ের মাধ্যমে এ বিষয়টিও পুনর্ব্যক্ত করা হয় যে, বিদেশি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রদান সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত বিষয়, এমনকি কোনো বিধিবদ্ধ দাবি বা ব্যক্তিগত অধিকারও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক বিশেষাধিকারকে খর্ব করতে পারে না। প্রধান বিচারপতি রবার্টস ভিন্নমত পোষণ করে বলেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের এই রায় একটি অস্বাস্থ্যকর নজির স্থাপন করবে, যার ফলে সংবিধানে স্পষ্টভাবে অনুমোদিত নয় এমন ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি আইন প্রণীত বিধান অগ্রাহ্য করার সুযোগ পেতে পারেন। বিচারপতি স্কালিয়া বলেন, স্বীকৃতি একটি আনুষ্ঠানিক আইনগত প্রক্রিয়া, আর পাসপোর্ট কেবল একটি প্রশাসনিক নথি; অতএব রাষ্ট্রপতি এর গৌণ পরিণতিসমূহ অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছেন। ভিন্নমতকারী বিচারপতিগণ কংগ্রেসীয় তদারকির ক্ষতির বিনিময়ে নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত সম্প্রসারণের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চের মতে, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ঐক্য ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়।

সংশ্লিষ্ট আইনি নীতি :

রাজনৈতিক প্রশ্ন মতবাদ: রাজনৈতিক প্রশ্ন মতবাদ অনুযায়ী, কিছু বিষয় আদালতের পরিবর্তে রাজনৈতিক শাখাগুলোর, অর্থাৎ, নির্বাহী বা আইনসভা দ্বারা সমাধান করাই অধিক উপযুক্ত। এই নীতির অধীনে বিচার বিভাগ এমন বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকে, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা, নীতি নির্ধারণ বা স্পষ্ট আইনি মানদণ্ডের অভাব রয়েছে। এই মতবাদ প্রতিফলিত করে যে কিছু প্রশ্ন এতটাই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল যে তা এক অরাজনৈতিক বিচার বিভাগের যথাযথ ভূমিকার সীমার বাইরে অবস্থান করে।

লোয়েস্ট এব মতবাদ: লোয়েস্ট এব মতবাদ বলতে বোঝায় যে, রাষ্ট্রপতি যখন কংগ্রেসের স্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তখন তার ক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করে এবং সে ক্ষেত্রে নির্বাহী ক্ষমতা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ ও বিচারিক পর্যালোচনার অধীন থাকে।

সংশ্লিষ্ট আইন :

  1. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান
  2. বৈদেশিক সম্পর্ক অনুমোদন আইন (২০০২) (যুক্তরাষ্ট্র)
    • ধারা: ২১৪(ঘ)

অনুবাদক :
. ফাহিম আহমেদ
. মো. আতিকুর রহমান

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share