আবদুল হাই এবং অন্যান্য বনাম মাহবুব এবং অন্যান্য
সাইটেশন : 60 DLR (2008)
জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ
আপিলকারী : আবদুল হাই এবং অন্যান্য
বিবাদী : মাহবুব এবং অন্যান্য
ঘটনা :
উক্ত আপিল আবেদনটি করা হয়েছিল সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ধারা ৯২ অনুযায়ী। ২৪ অক্টোবর ১৯৯৬ তারিখে প্রদান করা মামলা নং ১২১৯/১৯৮৫ এর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হয়। উক্ত রায়ে বাদীর মালিকানার স্বীকৃত এবং জমির খাস দখল পুনরুদ্ধারের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। মামলার জমিটি মূলত ভাওয়াল রাজ এস্টেটের ছিল। পরবর্তীতে জমিটি পারিবারিক দেবতা ‘শ্রী শ্রী মাধব’ -এর নামে দান করা হয় এবং তা দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়, যা কোর্ট অব ওয়ার্ডসের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। বিবাদী চাঁদ মিয়া ১৩৭১ বঙ্গাব্দ হতে দশ বছরের জন্য একটি নিবন্ধিত কবুলিয়তের মাধ্যমে আধি বর্গা নেন। বাদী এর আগে দুটি মামলায় (Title Suit No. 12 of 1976 ও Title Suit No. 14 of 1976) বিবাদী চাঁদ মিয়ার বিরুদ্ধে ডিক্রি লাভ করেন এবং (Execution Case No. 2 of 1977 ও Execution Case No. 7 of 1977) এর মাধ্যমে জমির খাসদখল পুনরুদ্ধার করেন। ১৩৮৬ বঙ্গাব্দের স্বল্পমেয়াদি ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বিবাদীরা জমি দখলে রাখে এবং ১১ জুলাই ১৯৭৯ তারিখে জমি খালি করতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে বর্তমান মামলাটি দায়ের করা হয়। বিবাদীপক্ষের মধ্যে বিবাদী নং ৬ দাবি করেন যে, তিনি চাঁদ মিয়ার কাছ থেকে এসএ খতিয়ান নং ৬৩ এর ভিত্তিতে দাগ নং ১৪৭ এর ১.০৫ একর জমি ক্রয় করেছেন এবং জমিটির দেবোত্তর সম্পত্তি ছিলো এ বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে, বিচারিক আদালত বাদীপক্ষ কর্তৃক উত্থাপিত মৌখিক ও দালিলিক প্রমাণ গ্রহণ করেন, বিবাদীদের দাবি খারিজ করেন এবং মামলাটির ডিক্রি প্রদান করেন।
ইস্যু :
১. বাদী দালিলিক নথি সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে জমিটি দেবোত্তর সম্পত্তি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন কি না এবং সাক্ষ্য আইন-এর ধারা ৯১ ও ৯২ অনুযায়ী বিবাদীগণ বাদীর লিখিত দলিল অস্বীকার করতে পারে কি না।
২. বিবাদীরা কি চাঁদ মিয়ার নিকট থেকে কথিত ক্রয়ের মাধ্যমে বৈধ স্বত্ব প্রমাণ করতে পেরেছেন কি না এবং তারা যে এসএ খতিয়ানের ওপর নির্ভর করেছেন, তা প্রকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য কি না।
৩. ১৩৮৬ বঙ্গাব্দে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবং চাঁদ মিয়ার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী ডিক্রি ও এক্সিকিউশন থাকা সত্ত্বেও বিবাদীদের অব্যাহত দখল আইনত গ্রহণযোগ্য কি না?
যুক্তিতর্ক :
আপিলকারী পক্ষের যুক্তি :
আপিলকারীগণ যুক্তি দেন যে, বাদীর দেওয়া ‘কবুলিয়ত’ দলিলটি ভুয়া বা জাল। ফলে, সাক্ষ্য আইনের ৯২ ধারা অনুযায়ী এর কোনো আইনি গ্রহণযোগ্যতা নেই। আর, কোনো দলিল যদি জাল বলে প্রমাণিত হয়, তবে তা মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। তারা আরও দাবি করেন যে, এসএ খতিয়ান নং ৬৩–এ চাঁদ মিয়া ও বশিরউদ্দিনকে মালিক হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং বিচারিক আদালত এই রেকর্ডের যথাযথ মূল্যায়ন করেননি। তারা আরো বলেন, বাদীর দলিলের সঙ্গে আরজিতে বর্ণিত জমির বিবরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ফলে খাস দখলের ডিক্রির আইনি গ্রহণযোগ্যতা নেই। তারা আরও যুক্তি দেন যে, বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী মৌখিক বন্দোবস্ত বৈধ এবং মূল জমিদারদের কাছ থেকে চাঁদ মিয়ার মৌখিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে একটি বৈধ দখল স্বত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, যা বিচারিক আদালত পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন। তাদের বক্তব্যের সমর্থনে তারা DLR 447, 7 DLR 61 এবং 12 DLR 246–এর মামলার নজির উল্লেখ করেন। সর্বশেষ আপিলকারীগণ উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী এক্সিকিউশন এর মাধ্যমে বাদী প্রকৃতপক্ষে দখল পুনরুদ্ধার করেছেন এ বিষয়টি বাদী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সুতরাং সেই প্রেক্ষিতে বাদীর অনুকূলে ডিক্রি প্রদান করা আইনসংগত হয়নি।
বিবাদী পক্ষের যুক্তি:
বিবাদীপক্ষ যুক্তি দেন, এসএ এবং আরএস খতিয়ান অনুযায়ী জমিটি ভাওয়াল রাজ এস্টেটের দেবত্তোর সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত যা শ্রী শ্রী মাধব এর নামে দান করা হয়েছে এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ধারা ৯২ অনুযায়ী এই দালিলিক প্রমাণটিকে অস্বীকার করা যায় না। তারা যুক্তি দেন যে, চাঁদ মিয়া কেবল ১৩৭১ বঙ্গাব্দের নিবন্ধিত কবুলিয়তের অধীনে একজন আধি বর্গাদার ছিলেন এবং তিনি কোনো মালিকানা অর্জন করেননি। এছাড়া বিবাদী নং-৬ এর ক্রয়ের দাবিও আইনত অগ্রহণযোগ্য, কারণ এই দাবির সমর্থনে তিনি কোনো দলিল উপস্থাপন করেননি। তারা আরও বলেন, বাদী ইতোমধ্যে (Title Suit Numbers 12 of 1976 and 14 of 1976) এ ডিক্রি লাভ করেছেন এবং এক্সিকিউশনের মাধ্যমে জমির দখল পুনরুদ্ধার করেছেন, তাই বিবাদীদের জমিতে অবস্থান করার কোনো আইনগত অধিকার নেই।
সিদ্ধান্ত :
আদালত রায় দেন যে বৈধ দলিলগত প্রমাণের মাধ্যমে মামলার জমিটি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে বাদীর স্বত্ব প্রমাণিত হয়েছে এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ -এর ধারা ৯২ অনুযায়ী জালিয়াতি প্রমাণ না করে বিবাদীরা সেই দলিলগুলোর বিরোধিতা করতে পারে না, যা তারা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আদালত বাদীর এস.এ. ও আর.এস. খতিয়ানকে প্রকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করেন, বিবাদীদের এস.এ. খতিয়ানকে অবিশ্বাসযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং চাঁদ মিয়ার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী ডিক্রি ও এক্সিকিউশন কার্যক্রমকে বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করেন।
যেহেতু বিবাদীদের কোনো বৈধ স্বত্ব বা দখলের অধিকার ছিল না, তাই আপিল খারিজ করা হয় এবং ২৪ অক্টোবর ১৯৯৬ তারিখের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট আইন :
- সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২
- ধারা : ৯১, ৯২
- বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৮৮৫
অনুবাদক :
১. ফাহিম আহমেদ
[সতর্কতা : উক্ত মামলার বাংলা সংস্করণটি মূল ইংরেজি হতে অনূদিত। অর্থগত সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কোনো প্রকার অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হলে, মূল ইংরেজি সংস্করণ প্রাধান্য পাবে।]
নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ