ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ (১৯৯৬)

Dr. Mohiuddin Farooque vs Bangladesh (The Radiated Milk Case) [1996]

ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ (রেডিয়েটেড মিল্ক কেইস)

সাইটেশন : 48 DLR (1996) 438

জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ

আপিলকারী : ড. মহিউদ্দিন ফারুক
বিবাদী : বাংলাদেশ (পক্ষে- সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন; কালেক্টর অব কাস্টমস) এবং ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক বাংলাদেশ লিমিটেড

ঘটনা :

ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক বাংলাদেশ লিমিটেড নেদারল্যান্ডসের ডাট্রাকো বিএভি (Datraco BV) থেকে তিনটি চালানে মোট ৫০০ মেট্রিক টন স্কিমড মিল্ক পাউডার আমদানি করে। এর মধ্যে শেষ চালানের ১২৫ মেট্রিক টন গুঁড়া দুধ থেকে একটি নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চট্টগ্রামস্থ রেডিয়েশন টেস্টিং ল্যাবরেটরি (RTL)-এ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে প্রতি কেজিতে ১৩৩ বেকেরেল (Bq) মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যায়, যা অনুমোদিত সর্বোচ্চ মাত্রা ৯৫ বেকেরেল (Bq) প্রতি কেজির তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে, আরটিএল (RTL), চট্টগ্রামের পরিচালক একটি সনদ প্রদান করেন, যাতে জনস্বার্থে শেষ চালানের গুঁড়া দুধ বাজারজাত না করার সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে, জরিপকারী সংস্থা SGS-এর অনুরোধে উক্ত চালানের পাঁচটি কনটেইনার থেকে পাঁচটি নমুনা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ঢাকাস্থ পরীক্ষাগারে পুনঃপরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সেখানে একটি নমুনায় প্রতি কেজিতে মাত্র ১৫ বেকেরেল (Bq) তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যায়। এরপর পুনরায় পরীক্ষার জন্য আরও পাঁচটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ বিষয়ে আরটিএল, চট্টগ্রামের পরিচালক অতিরিক্ত পরীক্ষা পরিচালনার বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে, কাস্টমসের কালেক্টর আমদানিকারককে নির্দেশ দেন যে, অনুমোদিত তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা অতিক্রম করায় গুঁড়া দুধের চালানটি রপ্তানিকারকের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে। তবে পরবর্তীতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সচিব কাস্টমসের কালেক্টরকে নির্দেশ দেন যে, আরটিএল, চট্টগ্রামের পরিচালকের উপস্থিতিতে প্রতিটি কনটেইনার থেকে এলোমেলোভাবে (randomly) নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে।

পুনরায় পরীক্ষা (retesting) ছাড়াই পণ্য ফেরত পাঠানোর নির্দেশকে অবৈধ ঘোষণা করা হোক এবং নমুনাগুলোর পুনঃপরীক্ষার জন্য একটি বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা (mandatory injunction) জারি করা হোক এইমর্মে রপ্তানিকারক যথাক্রমে সরকার (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব), কাস্টমসের কালেক্টর এবং আমদানিকারককে বিবাদী করে চট্টগ্রামের তৃতীয় সহকারী জজ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন।   এদিকে, চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (Chief Metropolitan Magistrate) চালানটি জব্দ করার জন্য পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে চূড়ান্ত পুনঃপরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চট্টগ্রামস্থ রেডিয়েশন টেস্টিং ল্যাবরেটরি (RTL) পরীক্ষায় দেখতে পায় যে, একটি কনটেইনার থেকে সংগৃহীত ৫টি নমুনায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয়তা রয়েছে। একইভাবে, কমিশনের সাভারস্থ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (Institute of Nuclear Science and Technology) পরীক্ষায় দেখতে পায় যে, দুটি কনটেইনার থেকে সংগৃহীত মোট ১০টি নমুনায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বিদ্যমান।

আবেদনকারী, বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (BELA)-এর মহাসচিব, জনস্বার্থে একটি রিট দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন যে, এ ধরনের খাদ্যপণ্য আমদানি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং জনগণের জীবনের অধিকারের (Right to Life) প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে।তিনি আরও যুক্তি দেন যে, এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের পরিপন্থি। তাই তিনি আদালতের নিকট প্রার্থনা করেন, বিবাদীদের যেন অবিলম্বে উক্ত পণ্য রপ্তানিকারকের কাছে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।অন্যদিকে, বিবাদী আমদানিকারক যুক্তি দেন যে, সমগ্র চালানের তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা অনুমোদিত সীমার উপরে নয়। তাই পুরো চালান ফেরত পাঠানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি আরও দাবি করেন যে, বিষয়টি নিয়ে অধস্তন আদালতে (subordinate court) একটি দেওয়ানি মামলা তখনও বিচারাধীন (pending) ছিল। ফলে, হাইকোর্ট বিভাগ তার রিট এখতিয়ার (writ jurisdiction) প্রয়োগ করে এ মামলায় কোনো প্রকৃত ঘটনা-সংক্রান্ত (question of fact) বিষয় নির্ধারণ করতে পারে না।

ইস্যু :
১. সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের আলোকে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত খাদ্য আমদানি জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন কি না।
২. নমুনাগুলো বারবার পরীক্ষা (Repeated Retesting) করা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতার মধ্যে ছিল কি না।
৩. অধস্তন আদালতে (Subordinate Court) বিচারাধীন (Sub Judice) থাকা সত্ত্বেও হাইকোর্ট বিভাগ (HCD) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন কি না।

সিদ্ধান্ত :

সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকার (Right to Life)-এর ব্যাখ্যার পরিধি সম্প্রসারণের জন্য হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন বিদেশি আদালতের বিচারিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করেন। বিচারপতি কাজী ইবাদুল হক বলেন:
“জীবনের অধিকার (Right to Life) কেবল জীবন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার সুরক্ষা, জীবিকার উপায়ের নিরাপত্তা, দূষণমুক্ত পানি ও বায়ু ভোগের অধিকার, জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা, শিক্ষার সুযোগ, শিশুদের বিকাশ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অবাধ চলাচল, জনস্বাস্থ্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনমান নিশ্চিত করাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।”

আদালত আরও রায় দেন যে, যদিও সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য (judicially enforceable) নয়, তবুও ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে “জীবনের অধিকার”-এর অর্থ ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আদালত বলেন, জীবনের অধিকার বলতে একজন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক আয়ুষ্কালের (normal longevity) সুরক্ষাকেও বোঝায়। অতএব, দূষিত বা তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত খাদ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণ জনগণের জীবনের অধিকারের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের খাদ্যের ব্যবহার প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

হাইকোর্ট বিভাগ (HCD) দেখতে পান যে, আরটিএল (RTL), চট্টগ্রামের পরিচালক প্রথম পরীক্ষার সনদ (certificate) দেওয়ার পরও নতুন নমুনা বারবার পুনঃপরীক্ষা (retesting) করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো আইনগত ক্ষমতা (authority) ছিল না। এছাড়াও আদালত লক্ষ্য করেন যে, শুরুতে কেবল একটি কনটেইনার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার পদ্ধতিটি নির্ভুল (foolproof) ছিল না। এর ফলে দূষিত বা অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত নমুনা সহজেই পরীক্ষার বাইরে থেকে যেতে পারতো। এ কারণে আদালত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য একটি নির্ভুল (foolproof) পদ্ধতি প্রণয়নের নির্দেশ দেন। সেই পদ্ধতি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত আদালত কাস্টমসের কালেক্টরকে নির্দেশ দেন যে, প্রতিটি কনটেইনার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা আরটিএল (RTL), চট্টগ্রামে পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে এবং একবার পরীক্ষার পর একই নমুনা আর কোনো প্রতিষ্ঠানে বা পুনরায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো যাবে না।

তবে আদালত পণ্যগুলো রপ্তানিকারকের কাছে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি। কারণ, বিষয়টি তখনও অধস্তন আদালতে (subordinate court) বিচারাধীন (sub judice) ছিল। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেন যে, তিনি অধস্তন আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে চান না।

তবে হাইকোর্ট বিভাগ সরকার এবং কাস্টমসের কালেক্টরকে নির্দেশ দেন যে, তারা রপ্তানিকারকের দায়ের করা মামলায় যথাযথভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা (contest) করবেন। এজন্য তারা অধস্তন আদালতে লিখিত জবাব (written statement) দাখিল করবেন এবং সকল প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র উপস্থাপন করবেন, যাতে বাদী-রপ্তানিকারক একতরফা ডিক্রি (ex parte decree) লাভ করতে না পারেন।

প্রাসঙ্গিক আইনি নীতি :

রেস সাবজুডিস: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ১০ নং ধারা অনুযায়ী, একই পক্ষগণের মধ্যে একই বিষয়বস্তু নিয়ে আদালতে পূর্ববর্তী কোনো মামলা বিচারাধীন থাকলে, অনুরূপ পরবর্তী কোনো মামলার বিচার করা যাবে না। এটি একই সময় দুটি মামলা পরিচালনা ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ করে।

প্রাসঙ্গিক আইন :

  1. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
    • অনুচ্ছেদ : ১৮(১), ৩১, ৩২

অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান
২. রাইয়ান তালুকদার

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share