ঝর্ণা রানী সাহা বনাম খন্দকার জায়েদুল হক ওরফে জাহাঙ্গীর ও অন্যান্য
সাইটেশন : 52 DLR (AD) 66
জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ
আপিলকারী : ঝর্ণা রাণী সাহা
বিবাদী : খন্দকার জায়েদুল হক ওরফে জাহাঙ্গীর ও অন্যান্য
ঘটনা :
আপিলকারী ঝর্ণা রাণী সাহা ১২ আগস্ট ১৯৯৭ তারিখে একটি লিখিত অভিযোগ (এজাহার) দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন যে, তার কন্যা লতা রাণী সাহাকে বিবাদী খোন্দকার জায়েদুল হক (মেয়েটির গৃহশিক্ষক) এবং অন্যান্যরা অপহরণ করেছে। অভিযোগে আরও বলা হয় যে, মেয়েটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে এই অপহরণ সংঘটিত হয়। তদন্ত শেষে মেডিক্যাল প্রতিবেদনে মেয়েটির বয়স আনুমানিক ১৭ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয় যে, সে যৌন সম্পর্কে অভ্যস্ত ছিল; তবে সাম্প্রতিক জোরপূর্বক যৌনসংগমের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিকভাবে মেয়েটিকে বিবাদীর পিতার জিম্মায় (custody/jimma) প্রদান করেন, ফলশ্রুতিতে মেয়েটি কার হেফাজতে থাকবে এ সংক্রান্ত আইনি বিরোধ শুরু হয়। পরবর্তীতে বিজ্ঞ দায়রা জজ সেই আদেশ বাতিল করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মেয়েটিকে আইনি হেফাজতে (কারাগারে) প্রেরণের নির্দেশ দেন। এরপর বিবাদী ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারার অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেন এবং ‘হেবিয়াস কর্পাস’ এখতিয়ার প্রয়োগের মাধ্যমে মেয়েটির আইনি হেফাজতের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন। মেডিক্যাল প্রতিবেদনে মেয়েটির বয়স প্রায় ১৮ বছর উল্লিখিত হওয়ার হাইকোর্ট বিভাগ তাকে “সে যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাওয়ার” স্বাধীনতা প্রদান করেন। পরবর্তীতে মেয়েটির মা হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন।
ইস্যু :
১. নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে অপহরণের অভিযোগে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায়, হাইকোর্ট বিভাগ ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারার অধীনে তাঁর এখতিয়ার যথাযথভাবে প্রয়োগ করে মেয়েটিকে ইচ্ছামতো যেকোনো স্থানে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছিল কি না।
যুক্তিতর্ক :
আপিলকারী পক্ষের যুক্তি:
আপিলকারী পক্ষ যুক্তি দেন যে, প্রাথমিক প্রমাণ, বিশেষ করে মেয়েটির জন্মছক (হোরোস্কোপ) এবং বিদ্যালয়ের সনদপত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনার সময় সে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল (প্রায় ১৫ বছর বয়সী)। আরও দাবি করা হয় যে, হাইকোর্ট বিভাগের আদেশটি একতরফাভাবে (ex parte) প্রদান করা হয়েছিল, কারণ মেয়েটির মাকে তার বক্তব্য উপস্থাপনের যথাযথ ও যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেওয়া হয়নি। আপিলকারী পক্ষ আরও যুক্তি দেন যে, যেহেতু মেয়েটি একটি অপরাধের ভুক্তভোগী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাই তাকে কারাগারে রাখা বা অভিযুক্তের পরিবারের জিম্মায় দেওয়ার পরিবর্তে তার পিতা-মাতার জিম্মায় ফিরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।
বিবাদী পক্ষের যুক্তি:
বিবাদী পক্ষ দাবি করেন যে, মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের বেশি ছিল এবং সে স্বেচ্ছায় বাড়ি ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। পরবর্তীতে সে নিজ ইচ্ছায় বিবাদীকে বিয়ে করে। এ দাবির সমর্থনে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার অধীনে মেয়েটির দেওয়া জবানবন্দি উল্লেখ করেন, যা বিবাদী পক্ষের বক্তব্যকেই সমর্থন করে। বিবাদীপক্ষের আইনজীবী আরও যুক্তি দেন যে, মেয়েটিকে হয় আইনি হেফাজতে রাখা উচিত, অথবা আদালত তার নিজস্ব (মেয়েটির) মতামত শোনার পর তার হেফাজতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, মেয়েটিকে তার মায়ের জিম্মায় দিলে বিচারকার্য প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
সিদ্ধান্ত :
আপিল বিভাগ আপিলটি মঞ্জুর করেন এবং হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ বাতিল করেন। আদালত বলেন, যদিও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তির হেফাজতের বৈধতা বা যথার্থতা পরীক্ষা করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে, তবে সেই ক্ষমতা অবশ্যই মামলার সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আদালত আরও বলেন, হাইকোর্ট বিভাগ অপহরণের অভিযোগ এবং চলমান তদন্তসহ মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। যেহেতু প্রাথমিক প্রমাণ, যেমন : বিদ্যালয়ের সনদপত্র, থেকে প্রতীয়মান হয় যে মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল, তাই তাকে কোথায় যাবে সে বিষয়ে নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া যায় না। আদালত মন্তব্য করেন যে, যদিও কোনো মেয়েকে কারাগারে রাখা ‘অমানবিক’, তথাপি একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীর জন্য অভিযুক্তের পরিবারের পরিবর্তে তার পিতা-মাতার সঙ্গে থাকাই ‘যথার্থ ও সমীচীন’। অতএব, মামলার পরিস্থিতিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারার অধীনে মেয়েটিকে ‘তার ইচ্ছামতো যেকোনো স্থানে যাওয়ার’ অনুমতি প্রদান করে হাইকোর্ট বিভাগ তার ‘হেবিয়াস কর্পাস’-সংক্রান্ত এখতিয়ার যথাযথভাবে প্রয়োগ করেনি বলে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
ফলস্বরূপ, আদালত নির্দেশ দেন যে, মেয়েটিকে অবিলম্বে জেলা কারাগার থেকে মুক্ত করে তার মায়ের জিম্মায় প্রদান করা হবে। আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, মেয়েটির বয়স এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসমূহের নিষ্পত্তি বিচার চলাকালে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই করা হবে।
সংশ্লিষ্ট আইন :
- ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
- ধারা: ৪৯১
- নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান), ১৯৯৫ [নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-দ্বারা রহিত]
অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান
[সতর্কতা : উক্ত মামলার বাংলা সংস্করণটি মূল ইংরেজি হতে অনূদিত। অর্থগত সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কোনো প্রকার অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হলে, মূল ইংরেজি সংস্করণ প্রাধান্য পাবে।]
নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ