কুশাল রাও বনাম বোম্বে রাজ্য (১৯৫৮)

Khushal Rao v The State of Bombay (1958)

কুশাল রাও বনাম বোম্বে রাজ্য

সাইটেশন : 1958 AIR 22

জুরিসডিকশন : ভারত

আপিলকারী : কুশাল রাও (নিম্ন আদালতে বিবাদী)
বিবাদী : বোম্বে রাজ্য (নিম্ন আদালতে বাদী)

ঘটনা :

উক্ত মামলাটি বাবুলাল নামক একজন ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। যেখানে একটি সরু গলিতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আক্রমণ করা হয়েছিল। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের মূল ভিত্তি ছিলো নিহত ব্যক্তির করা তিনটি ধারাবাহিক মৃত্যুপূর্ব জবানবন্দি, যা হামলার দুই ঘণ্টার মধ্যেই প্রদান করা হয়েছিল। প্রথমটি তিনি (নিহত ব্যক্তি) একজন চিকিৎসকের নিকট প্রদান করেছিলেন, দ্বিতীয়টি একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের নিকট, এবং তৃতীয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে একজন ম্যাজিস্ট্রেট নথিভুক্ত করেছিলেন। তিনটি ঘোষণাতেই বাবুলাল একইভাবে অভিযুক্ত কুশাল রাও এবং তার সহযোগী তুকারামকে হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন।

ভুক্তভোগীর শরীরে একাধিক আঘাত ছিল, এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণে দেখা যায় যে, সেগুলো বর্ণিত অস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হাইকোর্ট এর আগে চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর মৌখিক সাক্ষ্য পক্ষপাতদুষ্ট ও অবিশ্বস্ত অবহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দিগুলোই প্রধান প্রমাণ হিসেবে রয়ে যায়। এছাড়াও, হামলার কয়েক দিন পর অভিযুক্তকে একটি তালাবদ্ধ কক্ষে লুকিয়ে থাকতে পাওয়া যায়, উক্ত ঘটনাকে রাষ্ট্রপক্ষ তার (অভিযুক্তের) পলাতক আচরণের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে।

ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৪(১)(গ) অনুযায়ী, হাইকোর্ট যদি কোনো মামলাকে আপিলের জন্য উপযুক্ত বলে প্রত্যয়ন না করেন, তবে কোনো ব্যক্তি উক্ত মামলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন না। সাধারণত এই ধরনের প্রত্যয়ন তখনই দেওয়া হয়, যখন মামলায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন থাকে বা এমন জটিলতা থাকে, যা শুধু সর্বোচ্চ আদালতের নিষ্পত্তি করা উচিত। ফলে হাইকোর্টের বিচারকগণ এক ধরনের আইনি সংকটে পড়েছিলেন। একদিকে তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দি সত্য এবং খুশাল রাও দোষী। অপরদিকে, সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী একটি রায় (রাম নাথ বনাম মধ্যপ্রদেশ রাজ্য), যেখানে বলা হয়েছিল, অতিরিক্ত প্রমাণ (সমর্থন বা corroboration) ছাড়া শুধু মৃত্যুপূর্ব জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। কিন্তু হাইকোর্টের কাছে শক্তিশালী অতিরিক্ত প্রমাণ না থাকায়, তাঁরা মনে করেছিলেন যে, রাম নাথ মামলার রায় অনুসারে আইনগতভাবে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব নয়, যদিও হাইকোর্টের বিচারকগণ অভিযুক্তের অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তাই তাঁরা মামলাটিকে আপিলের জন্য উপযুক্ত বলে “Certificate of Fitness” প্রদান করেন।

ইস্যু :
১. অনুচ্ছেদ ১৩৪(১)(গ) অনুযায়ী হাইকোর্টের প্রদান করা “Certificate of Fitness” আইনগতভাবে সঠিক ছিল কি না।
২. স্বাধীন সমর্থনমূলক প্রমাণ (corroboration) ছাড়া কেবল মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া নিষিদ্ধ, – এরূপ কোনো আইনি বিধান বা সতর্কতামূলক নীতি আছে কি না।
৩. যেহেতু মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দি শপথ নিয়ে দেওয়া হয় না এবং এতে জেরা (cross-examination)-এর সুযোগ থাকে না তাই মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দি কি স্বভাবতই অন্যান্য প্রমাণের তুলনায় দুর্বল কি না।

যুক্তিতর্ক :

আপিলকারী পক্ষের যুক্তি:
আপিলকারী যুক্তি দেন যে, মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দি একটি দুর্বল প্রকৃতির প্রমাণ, কারণ এতে শপথের সুরক্ষা নেই এবং জেরা করার সুযোগও থাকে না। তাই স্বাধীন সমর্থনমূলক প্রমাণ ছাড়া এর ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিরাপদ নয়, যা রামনাথ মামলার নজির অনুযায়ীও সমর্থিত। তারা আরও দাবি করেন যে, ভুক্তভোগী হয়ত পক্ষপাতদুষ্ট বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত বা শেখানো কথাই বলেছেন, এবং অভিযুক্তের পলাতক থাকা আসলে একটি ভিন্ন আবগারি (excise) মামলার হাত থেকে বাঁচার জন্য ছিলো।

রাষ্ট্র পক্ষের যুক্তি:
অন্যদিকে, রাষ্ট্র পক্ষ যুক্তি দেয় যে, ধারা ৩২(১) মূলত এক ধরনের অপরিহার্যতার নীতি, যেখানে মৃত্যুর আশঙ্কা সত্য বলার একটি নিশ্চয়তা তৈরি করে, যা শপথের সমতুল্য। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, ঘোষণাগুলো ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বাধীন কর্মকর্তাদের দ্বারা গৃহীত, ফলে প্রভাবিত বা শিখিয়ে দেয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। রাষ্ট্রপক্ষ আরও দাবি করে যে, আদালত যদি বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হয়, তবে দণ্ড দেওয়ার জন্য আইনের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

সিদ্ধান্ত :

সুপ্রিম কোর্ট সাক্ষ্য আইনের ধারা ৩২(১) অনুযায়ী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করেন। একটি সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দি একাই যে কোনো দণ্ডাদেশের ভিত্তি হতে পারে। সমর্থনমূলক প্রমাণ অবশ্যই থাকতে হবে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দি অন্য কোনো প্রমাণের তুলনায় দুর্বল নয়, বরং এটি অন্যান্য প্রমাণের মতোই একই মানদণ্ডে যাচাই ও মূল্যায়ন করতে হবে। নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে আদালতকে দেখতে হবে, ভুক্তভোগীর ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের সুযোগ ছিল কি না (আলো বা দৃশ্যমানতা), তথ্য মনে রাখার মতো মানসিক সক্ষমতা ছিল কি না, এবং বক্তব্যটি সর্বত্র সংগতিপূর্ণ ছিল কি না। ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিতে জবানবন্দি প্রদানকারীর নিজস্ব ভাষায় নথিভুক্ত করা মৃত্যু পূর্ব জবানবন্দির প্রমাণ মূল্য মৌখিক সাক্ষ্য বা পুলিশের নোটের তুলনায় অনেক বেশি। আদালত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে যদি জবানবন্দিতে কোনো সুনির্দিষ্ট ত্রুটি বা দুর্বলতা খুঁজে পায়, তখনই কেবল অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজন হয়। যদি ঘোষণাটি নির্ভেজাল ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবে অতিরিক্ত প্রমাণ দরকার নেই।

সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের প্রদত্ত সার্টিফিকেটকে একটি কারিগরি ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা স্পষ্ট করেন যে, কেবল প্রমাণ মূল্যায়নে অসুবিধা হচ্ছে বা বিভ্রান্তি রয়েছে বলে হাইকোর্ট কোনো মামলাকে আপিলের জন্য পাঠাতে পারে না। প্রথমে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত দিতে হবে। কেবল তখনই মামলা উচ্চতর আদালতে পাঠানো উচিত, যখন সেখানে বড় এবং অনিষ্পন্ন কোনো আইনগত প্রশ্ন থাকে।

আদালত এ বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হন যে, বাবুলাল সুস্থ মানসিক অবস্থায় ছিলেন, হামলাকারীদের শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত আলো ছিল, এবং কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাকে প্রভাবিত করার আগেই তিনি জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তাই আদালত রায় দেন যে, উক্ত জবানবন্দি গুলো আইনগত ও বাস্তব উভয় দিক থেকেই দণ্ডাদেশ বহাল রাখার জন্য যথেষ্ট। সুপ্রিম কোর্ট আপিল খারিজ করেন এবং হাইকোর্ট প্রদত্ত রায় ও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

সংশ্লিষ্ট আইন :

  1. ভারতীয় দণ্ডবিধি, ১৮৬০
  2. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (ভারত)
    • ধারা : ৩২(১)
  3.  ভারতীয় সংবিধান
    • অনুচ্ছেদ: ১৩৪(২)(গ)

অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share