রাষ্ট্র বনাম নজরুল ইসলাম (২০০৫)

State v Nazrul Islam (2005)

রাষ্ট্র বনাম নজরুল ইসলাম @ নজরুল

সাইটেশন : 57 DLR (2005) 289

জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ

আপিলকারী: নজরুল ইসলাম (নিম্ন আদালতে বিবাদী)
বিবাদী : রাষ্ট্র (নিম্ন আদালতে বাদী)

ঘটনা :

নজরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী শালেমার প্রায় পাঁচ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। তাদের একজন পুত্রসন্তানও ছিল। ১৯৯৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, রাত আনুমানিক ৯ ঘটিকায়, শালেমা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন, এমন সময় নজরুল হঠাৎ প্রবেশ করে। সে তার চাচার বাড়ি থেকে নিয়ে আসা একটি কুড়াল দিয়ে শালেমার মাথায় প্রবল জোরে দুটি আঘাত করে। এতে শালেমার রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে তৎক্ষণাৎ কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলে, কর্তব্যরত চিকিৎস তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তদন্তে পুলিশ রক্তমাখা ভাত, থালা এবং মাটি উদ্ধার করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য গ্রহণ করেন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেন। সাক্ষীদের থেকে উঠে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, নজরুলের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ব্যাধির ইতিহাস। একাধিক রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী, তার মা, ননদ, প্রতিবেশী এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তাও বলেন, নজরুল স্থানীয়ভাবে “পাগলা নজরুল” নামে পরিচিত ছিল। এছাড়াও, প্রচণ্ড উন্মাদনার কারণে তাকে কয়েক দিন ধরে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং তার সঠিক ও ভুলের বিচার বোধ ছিল না। আগেও মানসিক অসুস্থতার সময় সে পোশাক ও গৃহস্থালির জিনিসপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ঘটনার পরপর সে পালিয়ে যায়নি, যা তার অস্বাভাবিক আচরণকেই নির্দেশ করে। এই সব সত্ত্বেও, বিচারিক আদালত অভিযুক্তের আগের ফৌজদারি ইতিহাস এবং অপ্রাসঙ্গিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বিবেচনা করে রায় প্রদান করেন এবং মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

ইস্যু :
১. অভিযুক্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, এটি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীগণ স্বীকার করা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত অভিযুক্তের উন্মাদনার বিষয়ক আর্জি উপেক্ষা করে ভুল করেছিল কি না, এবং তার পূর্ববর্তী অপরাধের ইতিহাস ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলোর ওপর নির্ভর করা আইনগতভাবে ভুল ছিল কি না।
২. ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারার অধীনে রেকর্ডকৃত জবানবন্দি কি প্রকৃত/প্রধান প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, অথবা সেগুলোর ভিত্তিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত বা adverse inference প্রদান করা যেতে পারে কি না।

যুক্তিতর্ক :

আপিলকারী পক্ষের যুক্তি:
আপিলকারী পক্ষ যুক্তি উত্থাপন করেন যে, অভিযুক্তের দীর্ঘদিনের মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের স্বীকারোক্তিকে উপেক্ষা করে বিচারিক আদালত গুরুতর আইনি ভুল করেছেন। এরকম সাক্ষ্য এবং ঘটনার পর নজরুলের অস্বাভাবিক আচরণ, সংশ্লিষ্ট সময়ে তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জোরালো যুক্তিসংগত সন্দেহ তৈরি করে। দণ্ডবিধির ৮৪ ধারার অধীনে বিবাদীর কাজ শুধু এটাই দেখানো যে, অভিযুক্তের মানসিক অবস্থার বিষয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ রয়েছে। সাধারণভাবে এই ধরনের ক্ষেত্রে বিবাদীর উন্মাদনা প্রমাণের জন্য চূড়ান্ত বা নিশ্চিত প্রমাণ দিতে হয় না; শুধু যুক্তিসংগত সন্দেহ তৈরি করাই যথেষ্ট, যা সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আপিলকারী পক্ষ আরও বলেন, বিচারিক আদালত এমন কিছু উপকরণের ওপর নির্ভর করেছিলেন, যেগুলো আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ এবং ১৬৪ ধারায় নেওয়া বিবৃতিগুলোকে ভুলভাবে প্রকৃত (substantive) প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৬১ ধারার বিবৃতি কেবল সাক্ষীর বিরুদ্ধে (contradict) ব্যবহারযোগ্য, আর ১৬৪ ধারার বিবৃতির প্রমাণ মূল্যও সীমিত, যতক্ষণ না তা পুরোপুরি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়। আপিলকারী পক্ষ আরও বলেন, অভিযুক্তের পূর্বের অপরাধের ইতিহাস ভুলভাবে উপস্থাপন করে “খারাপ চরিত্র” দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাক্ষ্য আইনের ৫৪ ধারার বিরোধী, কারণ অভিযুক্তের চরিত্র কোনো বিচারাধীন বিষয় ছিল না। এছাড়াও বিচারিক আদালত ঘটনার বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের খবরও বিবেচনায় নিয়েছে, যা সম্পূর্ণ Hearsay বা পরোক্ষ বক্তব্য। সাক্ষ্য আইনের ৬০ এবং ৬২ ধারা অনুযায়ী “Hearsay evidence” আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।আপিলকারী পক্ষ দাবি করেন, এসব অগ্রহণযোগ্য উপাদানের ওপর নির্ভর করায় পুরো দণ্ডাদেশই অবৈধ এবং দুর্বল হয়ে গেছে।

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি:
রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেন যে, শুধু আগের অস্বাভাবিক আচরণ দেখালেই আইনের চোখে ঘটনাকালে অভিযুক্ত সত্যিই উন্মাদ ছিলেন এটি প্রমাণ হয় না। তারা বলেন, ঘটনার সময় অভিযুক্ত মানসিক রোগে ভুগছিলেন এমন কোনো চিকিৎসাপত্র বা বিশেষজ্ঞের মতামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ আরও যুক্তি দেন যে, হামলার ধরন, যেমন: নির্দিষ্ট অস্ত্র বেছে নেওয়া এবং মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে [মাথায়] আঘাত করা, এসব তার উদ্দেশ্য ও সচেতনতার প্রমাণ বহন করে। এগুলো থেকে অনুমান করা যায় যে, তিনি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ছিলেন।

প্রমাণ সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বলেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারার বিবৃতি প্রকৃত (substantive) প্রমাণ নয়। তবে, সাক্ষীর বয়ানে অসামঞ্জস্য খুঁজে বের করা বা অন্য প্রমাণকে সমর্থন করার জন্য এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষ আরও দাবি করেন যে, অভিযুক্তের পূর্বের অপরাধের ইতিহাস- তার আচরণগত প্রবণতা বোঝাতে সহায়ক হতে পারে। আর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ঘটনাপ্রবাহের সাধারণ প্রেক্ষাপট দিতে পারে, যদিও এর প্রমাণ মূল্য খুবই সীমিত।

সিদ্ধান্ত :

আদালত জানান, বিচারিক আদালত মানসিক অসুস্থতার (insanity plea) প্রশ্নটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যখন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরাই স্বীকার করেছেন যে, অভিযুক্ত মানসিকভাবে অসংলগ্ন ছিলেন, তখন আইনগতভাবে আদালতের দায়িত্ব ছিল এই বিষয়টি বিবেচনা করে দেখার যে, তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ আছে কি না। আপিল আদালত বলেন, সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারার শর্ত পূরণ হয়েছে, তাই অভিযুক্ত সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। আদালত আরও বলেন যে, বিচারক আদালত ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় গৃহীত বিবৃতি ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছেন। এসব বিবৃতি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ ধারণা তৈরি করতে বা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

আদালত উল্লেখ করেন:
“বিজ্ঞ বিচারক লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ কোনো সাক্ষীর বিবৃতি কখনোই প্রকৃত (substantive) প্রমাণ নয়। এটিকে শুধু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬২ ধারার অধীনে ব্যবহার করা যেতে পারে সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারায় বর্ণিত পদ্ধতিতে ওই সাক্ষীকে অসামঞ্জস্য দেখানোর জন্য। কোনো অবস্থায়ই এই বিবৃতি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিরূপ ধারণা তৈরির ভিত্তি হতে পারে না। একইভাবে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া কোনো বিবৃতিকে কখনোই উক্ত বিষয়ের সাক্ষ্যের প্রকৃত অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।”

আদালত আরও উল্লেখ করেন, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড টিকতে পারে না। বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৪ ধারার পরিপন্থীভাবে, ১৬৪ ধারায় লিপিবদ্ধ একটি সাক্ষীর বিবৃতিকে “স্বীকারোক্তি” হিসেবে গণ্য করেছেন। তারা বিবৃতি এবং স্বীকারোক্তির মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন। একইসাথে পূর্বের অপরাধের ইতিহাসও ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ অভিযুক্তকে তা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আপিল আদালত আরও দেখেন যে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিচারককে প্রভাবিত করেছে, যা বিচারকে ভুল পথে নিয়েছে। সর্বোপরি, আপিল আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, নজরুল সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের রেফারেন্স বাতিল করা হয় এবং তার দণ্ড সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট আইন :

  1. দণ্ডবিধি, ১৮৬০
    • ধারা : ৮৪
  2. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২
    • ধারা : ৫৪, ৬০, ৬২, ১০৫
  3. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
    • ধারা : ১৬১, ১৬৪, ৩৬৪

অনুবাদক :
১. রোজিনা আকতার নিশু

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share