রাষ্ট্র বনাম কাজল আহমেদ জালালী (২০০৭)

State vs Kajal Ahmed Jalali (2007) (absconding)

রাষ্ট্র বনাম কাজল আহমেদ জালালী

সাইটেশন : 59 DLR 345

জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ

আপিলকারী : রাষ্ট্র
বিবাদী : কাজল আহমেদ জালালী (পলাতক), ডা. রওশন আলম, হুমায়ুন কবির ওরফে ফুল মিয়া

ঘটনা :

মামলাটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার অধীনে একটি ডেথ রেফারেন্স বিষয়ক, যেখানে কাজল আহমেদ জালালীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করার জন্য আদালতের (হাইকোর্টের) অনুমোদন চাওয়া হয়। একই সময়ে, ডা. রওশন আলম এবং হুমায়ুন কবির @ ফুল মিয়া তাদের দণ্ড ও দোষী সাব্যস্ত হওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আপিল দায়ের করেন। যেটি মূলত বিএনপির রাজনৈতিক কর্মী সুজনকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগসংক্রান্ত ছিলো। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০০১ সালের ৩০–৩১ জুন রাতের মধ্যে রূপসদী গ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সুজনকে কাজল আহমেদ জালালী, হুমায়ুন কবির @ ফুল মিয়া এবং ডা. রওশন আলমের সহযোগীসহ একদল অভিযুক্ত পথরোধ করে।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী নং ৫৯, শ্যাম মিয়া, নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে বলেন, ভুক্তভোগীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে হাত-পা বেঁধে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং পরে তাকে অন্য একটি গাড়িতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এছাড়াও অভিযোগ করা হয় যে, ঘটনাটি পরিকল্পনার জন্য পূর্বে KDH ল্যাবরেটরিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক শত্রুতা ও হুমকির প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়। তদন্তের সময় প্রায় এগারো মাস পরে, ডা. রওশন আলমের মালিকানাধীন দুটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয় এবং সেগুলোর ভেতরে রক্তের দাগ পাওয়া যায়। সাক্ষীদের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নথিভুক্ত করা হয়।

তবে তদন্তের সময় বিভিন্ন অসংগতি দেখা যায়। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৫৯ -এর সাক্ষ্য উল্লেখযোগ্য বিলম্বের পরে সামনে আসে, এবং গাড়ি থেকে উদ্ধার করা রক্ত মানুষের রক্ত কিনা বা ভুক্তভোগীর সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা তা নিশ্চিত করা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আব্দুল মতিন, যিনি ভুক্তভোগীকে আহত অবস্থায় পেয়েছিলেন এবং অজ্ঞাত ব্যক্তিদের ওপর হামলার দায় আরোপ করেছিলেন, তাকে কার্যকরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সাক্ষীদেরও হাজির করা হয়নি, এবং গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত কার্যক্রম, যেমন : ফোন রেকর্ড সংগ্রহ ও গাড়ির চালককে খুঁজে বের করা, অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

ইস্যু :
১. রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী নং ৫৯, শ্যাম মিয়াকে একজন বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নির্ভর করা যায় কি না।
২. KDH ল্যাবরেটরিতে কথিত ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠকটি আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না।
৩. পারিপার্শ্বিক (circumstantial) প্রমাণ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে (beyond reasonable doubt) অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম কি না।
৪. গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ না করার কারণে সাক্ষ্য আইন-এর ১১৪(ছ) ধারার অধীনে আসামিরা সুবিধা পাওয়ার অধিকারী কি না।

যুক্তিতর্ক :

আপিলকারী পক্ষের যুক্তি: (রাষ্ট্র)
রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করে যে, সাক্ষী নাম্বার ৫৯ -এর সাক্ষ্য যথাক্রমে অপহরণ ও হত্যার বিষয়টি সরাসরি প্রমাণ করে। তারা জোর দিয়ে বলে যে, কথিত KDH ল্যাবরেটরির বৈঠকটি ডা. রওশন আলম এবং অন্যান্য আসামিদের জড়িত থাকা পূর্বপরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে। রাষ্ট্রপক্ষ পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভর করে, যেমন :- পূর্বের রাজনৈতিক শত্রুতা, সুজনের নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা প্রদান, আসামিদের দ্বারা হুমকি প্রদান, এবং আসামিদের গাড়ি থেকে রক্ত উদ্ধার- এগুলো তাদের সংশ্লিষ্টতার নির্দেশক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সাক্ষীদের ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দি সাক্ষ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণ এবং ষড়যন্ত্র সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে যে, এসব প্রমাণ একত্রে আসামিদের দ্বারা সমন্বিতভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের বিষয়টি প্রমাণ করে।

বিবাদী পক্ষের যুক্তি:
বিবাদী পক্ষ যুক্তি দেয় যে, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী নাম্বার ৫৯-এর সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য নয়, কারণ তার সাক্ষ্য তদন্তের ভেতর অনেক দেরিতে সামনে এসেছে। তারা আরও যুক্তি দেয় যে, ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিগুলোকে ভুলভাবে মৌলিক (substantive) প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এছাড়া, বিবাদী পক্ষ তদন্তে বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত ত্রুটির বিষয় তুলে ধরে, যার মধ্যে ছিলো যানবাহন জব্দ করতে বিলম্ব, চালক আব্দুল হালিমকে শনাক্ত করতে ব্যর্থতা, এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী যেমন বিবাদী পক্ষের সাক্ষী নাম্বার-১, আব্দুল মতিন, বাদল মিয়া এবং আলম খানকে জিজ্ঞাসাবাদ না করা। আরও বলা হয় যে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হুমকি এবং পূর্ব বিরোধ কোনোভাবেই আসামিদের সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত করার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

সিদ্ধান্ত :

সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স খারিজ করেন এবং আসামিদের ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করেন। আদালত রায় দেন যে, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী নাম্বার-৫৯ এর সাক্ষ্য স্বভাবগতভাবেই অবিশ্বাস্য (inherently unreliable) এবং এর ওপর ভিত্তি করে দণ্ড প্রদান করা যায় না। সুপ্রিম কোর্ট আরও উল্লেখ করেন যে, KDH ল্যাবরেটরিতে কথিত ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক প্রমাণিত হয়নি, কারণ কোনো সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্যভাবে ডা. রওশন আলমের উপস্থিতি বা অংশগ্রহণ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে পারেননি। ১৬৪ ধারার জবানবন্দিকে মৌলিক (substantive) প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা একটি আইনগত ভুল ছিল।

আদালত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পূর্ব শত্রুতার পারিপার্শ্বিক প্রমাণগুলো পর্যালোচনা করে বলেন যে, এসব পরিস্থিতি সন্দেহ সৃষ্টি করলেও তা সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তদন্তে বিভিন্ন ত্রুটি, যেমন: যানবাহন জব্দ করতে বিলম্ব, সূত্র ধরে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না করা, এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের পরীক্ষা না করা রাষ্ট্রপক্ষের মামলাকে আরও দুর্বল করে দেয়। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, সন্দেহ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা কখনোই ফৌজদারি দায় প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, আসামিদের অপরাধ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় অবিচ্ছিন্ন (unbroken) পারিপার্শ্বিক প্রমাণের শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আবার, যারা সুজনকে রাস্তায় আহত অবস্থায় দেখেছিলেন, সেই সাক্ষীদের সাক্ষ্যও রাষ্ট্রপক্ষ যথাযথভাবে উপস্থাপন করেনি। সুপ্রিম কোর্ট এই মর্মে উপসংহারে পৌঁছান যে, রাষ্ট্রপক্ষ তাদের ‘প্রমাণের দায় (burden of proof)’ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কাজল আহমেদ জালালী, ডা. রওশন আলম এবং হুমায়ুন কবির @ ফুল মিয়ার বিরুদ্ধে প্রদত্ত দণ্ড আইনগতভাবে টেকসই নয়।

উপর্যুক্ত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আদালত ডেথ রেফারেন্স খারিজ করেন এবং ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করেন। আসামিগণ যথাক্রমে কাজল আহমেদ জালালী, ডা. রওশন আলম এবং হুমায়ুন কবির @ ফুল মিয়া সকল অভিযোগ থেকে খালাসপ্রাপ্ত হন এবং তাদের উপর আরোপিত দায় হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট আইন :

  1. দণ্ডবিধি, ১৮৯০
    • ধারা: ৩৪, ১২০খ, ৩০২
  2. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২
    • ধারা : ১১৪(ছ), ১৪৫, ১৫৫(৩)
  3.  ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
    • ধারা: ১৬৪

অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share