আব্দুল হাকিম বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (২০১৪)

Abdul Hakim Vs Government of Bangladesh and Ors (2014)

আব্দুল হাকিম বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য

সাইটেশন : 67 DLR (2015) 83

জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ

আবেদনকারী : আব্দুল হাকিম
বিবাদী : বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যান্য

ঘটনা :

আবেদনকারী আব্দুল হাকিম একটি বেসরকারি মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর চাকুরির সময়কাল দুটি পৃথক আইনি ঘটনার মাধ্যমে চিহ্নিত। ২০০৪ সালে একটি অনুমোদিত শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে পরবর্তীতে একটি ফৌজদারি মামলায় খালাস পাওয়ার পর ২০০৯ সালে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল করে। পরবর্তীতে, ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান (বিবাদী নং–১০) একটি নতুন বরখাস্তের আদেশ জারি করেন। এই আদেশটি চেয়ারম্যান একতরফাভাবে জারি করেন, যা ম্যানেজিং কমিটির কোনো নতুন প্রস্তাব বা নোটিশ ছাড়াই করা হয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের বাধ্যতামূলক পূর্বানুমোদনও নেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যান কর্তৃক জারিকৃত উক্ত নতুন বরখাস্তের আদেশকে ন্যায়সংগত দেখানোর জন্য ২০০৪ সালের পূর্ববর্তী বোর্ড অনুমোদনকে ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করার চেষ্টা করেন, যে অনুমোদনটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়ে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, আবেদনকারী সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।

ইস্যু :
১. সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগ একটি বেসরকারি মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করার এখতিয়ার রাখে কি না।
২. একটি মাদ্রাসা বেসরকারি বা নন-গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হলেও, সেই মাদ্রাসার চেয়ারম্যান কি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত “প্রজাতন্ত্রের কার্যাবলির সাথে সংশ্লিষ্ট” কোনো দায়িত্ব পালন করেন কি না।
৩. ২০১১ সালের বরখাস্তের আদেশটি, যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নতুন বা পৃথক কোনো অনুমোদন গ্রহণ করা হয়নি, আইনগতভাবে বৈধ ছিল কি না।

যুক্তিতর্ক :

আবেদনকারী পক্ষের যুক্তি :
আবেদনকারীর আইনজীবী বিচারিক পর্যালোচনার পক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন যে, শিক্ষা একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্যের অংশ। ফলে কোনো মাদ্রাসা বেসরকারি উৎস থেকে পরিচালিত হলেও এর কার্যক্রমে একটি কার্যকরী ও জনস্বার্থমূলক উপাদান বিদ্যমান থাকে, যার কারণে এর সিদ্ধান্তসমূহ বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসে। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, এই বিষয়টি “প্রজাতন্ত্রের কার্যাবলির সাথে সম্পর্কিত” (In Connection with the Affairs of the Republic)। কারণ, মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন MPO (Monthly Pay Order) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কোষাগার থেকে প্রদান করা হয়। তাই কোনো শিক্ষকের বরখাস্ত কেবল একটি ব্যক্তিগত বা বেসরকারি বিষয় নয়; বরং এটি একটি জনস্বার্থসম্পন্ন বিষয়। এই যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি ডাটাফি মামলার functional test বা কার্যভিত্তিক পরীক্ষা উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে কোনো সংস্থার কার্যক্রম জনস্বার্থমূলক কি না তা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া, ১৯৭৮ সালের অধ্যাদেশের অধীনে একটি statutory delegate হিসেবে মাদ্রাসাটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত বা “রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে বোনা” (woven into the fabric of the State) বলে তিনি যুক্তি দেন। সবশেষে, তিনি ধারা ৩০ উল্লেখ করে বলেন যে, আইনগতভাবে মাদ্রাসার চেয়ারম্যানকে একজন “প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী” হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে, তিনি তাঁর সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো কাজকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা বেসরকারি কার্য হিসেবে দাবি করতে পারেন না।

বিবাদী পক্ষের যুক্তি:
বিবাদীর পক্ষ থেকে যুক্তি উত্থাপন করা হয় যে, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই এখানে চাকুরির সম্পর্কটি কোনো সংবিধিবদ্ধ সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি ব্যক্তিগত চাকুরির চুক্তি মাত্র। তারা আরও যুক্তি দেন যে, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দায়ের করা যায় না। সে কারণে আবেদনকারীর সংবিধানের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করা সঠিক প্রতিকার নয়। তাদের মতে, আবেদনকারীর একমাত্র প্রতিকার ছিল একটি দেওয়ানি মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করা। এছাড়াও তারা দাবি করেন যে, ২০১১ সালের বরখাস্তের আদেশটি বৈধ, কারণ এটি ২০০৪ সালের বিরোধেরই একটি ধারাবাহিকতা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল, সেটি তখনও কার্যকর ও প্রযোজ্য ছিল এবং সেই অনুমোদনের ভিত্তিতেই ২০১১ সালের আদেশটি জারি করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত :

আদালত এখানে উৎসভিত্তিক পরীক্ষা গ্রহণ না করে যুক্তরাজ্যের আদালতে প্রতিষ্ঠিত “আর ভি প্যানেল অন টেক-ওভারস অ্যান্ড মার্জারস, এক্সপার্ট ডেটাফিন (১৯৮৭)” মামলার “Functional Test” বা “কার্যভিত্তিক পরীক্ষা” এর নজির প্রয়োগ করেন। এই পরীক্ষার মূল ধারণা হলো- কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার উৎস নয়, বরং সে কী ধরনের কার্যাবলি সম্পাদন করছে তা বিচার করা হবে। অর্থাৎ, কোনো সংবিধিবদ্ধ না হলেও বা বেসরকারি হলেও যদি তা জনস্বার্থমূলক কার্য সম্পাদন করে, তবে সেটি বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করে যে, যদি কোনো সংস্থা জনস্বার্থমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বা তার কার্যক্রমে জনস্বার্থমূলক উপাদান থাকে, তবে সেটি বিচারিক পর্যালোচনার অধীন হবে।

আদালত মাদ্রাসার কার্যাবলিকে স্পষ্টভাবে সংবিধানের ১০২(২) অনুচ্ছেদের সাথে যুক্ত করে এবং নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন:
১. মাদ্রাসার চেয়ারম্যান প্রজাতন্ত্রের কার্যাবলির সাথে সম্পর্কিত কাজ সম্পাদন করেন, কারণ শিক্ষা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব।
২. সংবিধানের দৃষ্টিতে চেয়ারম্যান একজন “ব্যক্তি”, কারণ এই পদটি রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রদত্ত ক্ষমতার একজন ধারক।

আদালত আরও দেখতে পান যে, ২০১১ সালের বরখাস্তের আদেশটি স্বেচ্ছাচারিতার অংশ। ২০০৯ সালে আবেদনকারীকে পুনর্বহাল করা একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যার ফলে ২০০৪ সালের বোর্ড অনুমোদন অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু চেয়ারম্যান নতুন করে ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয় প্রস্তাব এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন গ্রহণ না করে বরখাস্তের আদেশ জারি করেন। ফলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, তিনি (চেয়ারম্যান) আইনগত ক্ষমতা ছাড়াই কাজ করেছেন। ফলস্বরূপ, ১২.০২.২০১১ তারিখের বরখাস্তের আদেশটি আইনগতভাবে অকার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। আদালত নির্দেশ দেন যে আবেদনকারীকে কোনো প্রকার বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই অবিলম্বে সুপারিনটেনডেন্ট পদে পুনর্বহাল করতে হবে। এছাড়াও, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, তারা ঘটনার বিষয়গুলো পুনরায় বিবেচনা করে ৩ মাসের মধ্যে একটি নতুন ও আইনসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এই বাধ্যতামূলক নির্দেশনাসহ আদালত রুল নিষ্পত্তি করেন।

সংশ্লিষ্ট আইনি নীতি:

কার্যভিত্তিক পরীক্ষা: Functional Test বা কার্যভিত্তিক পরীক্ষা মূলত কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার উৎসের উপর গুরুত্ব না দিয়ে, তারা কী ধরনের কার্যাবলি সম্পাদন করছে তার উপর গুরুত্ব দেয়। যদি কোনো সংস্থা জনস্বার্থমূলক বা সরকারি ধরনের কার্য সম্পাদন করে, তাহলে সেটি বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসবে, যদিও সেই সংস্থাটি সংবিধিবদ্ধ নয় এরূপ বা বেসরকারি ধরনের হয়ে থাকে। এই নীতিটি আর ভি প্যানেল অন টেক-ওভারস অ্যান্ড মার্জারস, এক্সপার্ট ডেটাফিন (১৯৮৭) মামলা থেকে এসেছে।

উৎসভিত্তিক পরীক্ষা: উৎসভিত্তিক পরীক্ষা অনুযায়ী কোনো সংস্থার ব্যবহৃত ক্ষমতার উৎসের উপর ভিত্তি করে উক্ত সংস্থাটি বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়বে কি না, তা নির্ধারণ করা হয়। যদি সেই ক্ষমতা কোনো আইন, সংবিধান বা বিশেষাধিকার থেকে আসে, তবে সেই সংস্থা বিচারিক পর্যালোচনার অধীন আসবে। কিন্তু যদি ক্ষমতাটি ব্যক্তিগত চুক্তি বা পারস্পরিক সম্মতি থেকে আসে, তাহলে সাধারণত বিচারিক পর্যালোচনা প্রযোজ্য হয় না।

সংশ্লিষ্ট আইন :

  1. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
    • অনুচ্ছেদ : ১৫(ক), ১৭, ১০২(২)

অনুবাদক :
. মো. আতিকুর রহমান

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share