রাষ্ট্র বনাম রওশন মণ্ডল (২০০৬)

The State Vs. Md. Roushan Mondal (2006)

রাষ্ট্র বনাম মো. রওশন মণ্ডল @ হাশেম

সাইটেশন : 26BCR (2006) (HCD)275

জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ

আপিলকারী: মো. রওশন মণ্ডল @ হাসেম (নিম্ন আদালতে বিবাদী)
বিবাদী : রাষ্ট্র (নিম্ন আদালতে বাদী)

ঘটনা :

৮ বছর বয়সী শিশু রিক্তা খাতুন ১৫ অক্টোবর ১৯৯৯ তারিখ রাতের বেলায় নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে তার বাড়ির নিকটবর্তী একটি হলুদ ক্ষেত থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত শিশুর পিতা একটি এজাহার দায়ের করেন; তবে এজাহারে কোনো নির্দিষ্ট আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। তদন্তকালে পুলিশ মো. রওশন মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর ২১ দিন। কামাল নামক এক ব্যক্তি তাকে পুলিশের নিকট হস্তান্তর করে; অথচ কামালের সঙ্গে ভুক্তভোগী পক্ষের পূর্বে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও সংঘর্ষ থাকলেও তদন্তে তাকে (কামালকে) জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি কিংবা সাক্ষী হিসেবেও পরীক্ষা করা হয়নি। 

তদন্ত চলাকালে রওশন মণ্ডল একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। পরবর্তীতে পুলিশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৬(২) এর অধীনে চার্জশিট দাখিল করে। দায়রা আদালত আসামির বয়স ১৫ বছর ২১ দিন নির্ধারণ করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করেন। উক্ত ট্রাইবুনালের বিচারক তখন বিচারিক আদালতকে কিশোর আদালত হিসেবে অভিহিত করে অভিযোগ গঠন করেন।

যদিও শিশু আইন, ১৯৭৪-এর ধারা ৬৬ অনুযায়ী আসামিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, তবুও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল কিশোর বিচার সংক্রান্ত বিধান ও পদ্ধতি অনুসরণ না করেই বিশেষ আইনের অধীনে তার বিচার পরিচালনা করে, যা আইনসম্মত ছিল না। মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিল না এবং রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণরূপে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর নির্ভর করেছিলেন। উক্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রেপ্তারের তিন দিন পর প্রদান করা হয়; যা অবৈধ আটক ও পুলিশি নির্যাতনের পর সংগৃহীত হওয়ায় তা স্বেচ্ছায় প্রদত্ত ছিল না। বিতর্কিত স্বীকারোক্তি ও দুর্বল পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে ট্রাইব্যুনাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৬(২) এর অধীনে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি হাইকোর্ট বিভাগের বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত হয়।

ইস্যু :
১. আসামি ঘটনাকালে নাবালক হওয়া সত্ত্বেও শিশু আইন, ১৯৭৪-এর বাধ্যতামূলক বিধানসমূহ অনুসরণ না করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক তার বিচার ও দণ্ডাদেশ প্রদান আইনসম্মত ও বৈধ ছিল কি না।
২. আসামির প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি স্বেচ্ছায় প্রদত্ত না হওয়া সত্ত্বেও এবং মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা নির্ভরযোগ্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ না থাকার পরও, তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত দণ্ডাদেশ ও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা যায় কি না।

সিদ্ধান্ত :

ইকোর্ট বিভাগ জানান, মামলাটির সম্পূর্ণ বিচার কার্যক্রমই ছিলো আইনি এখতিয়ার বহির্ভূত। যেহেতু আসামিকে ১৬ বছরের কম বয়সী নাবালক হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল, সেহেতু শিশু আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী মামলাটি একান্তভাবে কেবল কিশোর আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য ছিল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের কোনো আইনি ক্ষমতা ছিল না কোনো শিশুকে বিচার করার। তদুপরি, উক্ত ট্রাইব্যুনাল কিশোর আদালতের ভূমিকা পালন করতেও আইনত সক্ষম ছিল না। একইসঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগ এ মর্মে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, কিশোর আদালত কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে পারে না। ফলে আসামির দণ্ডাদেশ ও সাজা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অকার্যকর।

আদালত লক্ষ্য করেন যে, মূল বিচারে রাষ্ট্রপক্ষ ১১ জন সাক্ষীকে পরীক্ষা করলেও বিবাদী পক্ষ কোনো সাক্ষী উপস্থাপন করেননি, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে বিবাদী পক্ষ প্রসিকিউশনের মামলা দুর্বল বলেই বিবেচনা করেছিল। আবার সাক্ষীদের জেরা এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৪২ অনুযায়ী আসামির জবানবন্দি পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় যে, আসামি ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এসেছে। আদালত আরও জানান, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি স্বেচ্ছায় প্রদত্ত ছিল না। উক্ত স্বীকারোক্তি অবৈধ আটক ও পুলিশি নির্যাতনের পর গ্রহণ করা হয়েছিল বিধায় তা বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং এর ওপর নির্ভর করা যায় না। সর্বোপরি, নিহত শিশুর পিতা এজাহারে কিংবা সাক্ষ্য প্রদানকালে কোনো পর্যায়েই রওশন মণ্ডলের নাম উল্লেখ করেননি বা তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেননি। বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, আসামির তার কন্যার হত্যাকাণ্ডে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এতে করে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

যেহেতু মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিল না এবং আসামিকে অপরাধের সঙ্গে সংযুক্ত করে এমন কোনো পারিপার্শ্বিক প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি, সেহেতু রাষ্ট্রপক্ষ আসামির অপরাধ প্রমাণে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। আদালত আরও জানান, মামলাটি পুনরায় কিশোর আদালতে বিচারার্থে প্রেরণ করা অর্থহীন হবে, কারণ নতুন কোনো গ্রহণযোগ্য বা বৈধ প্রমাণ উদ্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পরিশেষে, হাইকোর্ট বিভাগ আসামির বিরুদ্ধে প্রদত্ত দণ্ডাদেশ ও মৃত্যুদণ্ড বাতিল ঘোষণা করেন, আপিল মঞ্জুর করেন এবং রওশন মণ্ডলকে সকল অভিযোগ থেকে খালাস প্রদান করেন। একই সঙ্গে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

সংশ্লিষ্ট আইন :

  1. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
    • ধারা : ৩৪২
  2.  শিশু আইন, ১৯৭৪ (রহিত)
    • ধারা : ৬৬
  3. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ১৯৯৫ (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ দ্বারা রহিত)
    • ধারা : ৬(২)

অনুবাদক :
১. মো. আতিকুর রহমান

নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ


Cite this Page:

OSCOLA

APA

Bluebook

Share