নুরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র
সাইটেশন : 13 BLC (2008) 218
জুরিসডিকশন : বাংলাদেশ
আপিলকারী: নুরুল ইসলাম (নিম্ন আদালতে বিবাদী)
বিবাদী : রাষ্ট্র (নিম্ন আদালতে বাদী)
ঘটনা :
মোছাম্মদ কাঞ্চন বিবি (ভুক্তভোগী) ছিলেন তাজুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। ৮/৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাজুল ইসলাম প্রায়ই তার সঙ্গে ঝগড়া করতেন এবং অনেক সময় মারধরও করতেন। ফলে কাঞ্চন বিবি প্রায়ই তার মা, মোছাম্মদ রুপিয়া বেগমের বাড়িতে চলে যেতেন। ঘটনার কিছুদিন আগে, ১০.০৯.১৯৯৪ তারিখে রুপিয়া বেগম (ভুক্তভোগীর মা) তার মেয়ের বাড়িতে যান এবং ১৭ দিন অবস্থান করে ২৮.০৯.১৯৯৪ তারিখে ফিরে আসেন। পরে আবার তিনি তাজুল ইসলামের বাড়িতে গেলে দেখেন তার মেয়ে কাঞ্চন বিবি বাড়িতে নেই। তিনি তাজুল ইসলামের কাছে “কাঞ্চন বিবির” খবর জানতে চাইলে তিনি (তাজুল ইসলাম) কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এতে রুপিয়া বেগম সন্দেহ করেন যে, তার মেয়েকে হয়তো তাজুল ইসলাম হত্যা করেছে। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি গ্রামপ্রধান এবং চেয়ারম্যানকে জানান। ১১.১০.১৯৯৪ তারিখে তিনি জানতে পারেন উজানী গ্রামের জঙ্গলে কাদা এবং রক্তমাখা একটি বস্তা পাওয়া গেছে। পরদিন পুলিশ বস্তা খুলে একটি মৃতদেহ উদ্ধার করলে, রুপিয়া বেগম লাশটি তার নিখোঁজ মেয়ে কাঞ্চন বিবির বলে শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি তাজুল ইসলাম এবং তার প্রথম স্ত্রী নুরজাহানের বিরুদ্ধে চান্দিনা থানায় একটি এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) দায়ের করেন। তদন্তের পর পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, যেখানে তাজুল ইসলামের [বিচারবহির্ভূত] জবানবন্দি [ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নয় এরূপ] -এর ভিত্তিতে নুরুল ইসলামের নামও আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিচারিক আদালত নুরুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৫,০০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও চার বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
ইস্যু :
১. কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তের (তাজুল ইসলাম) করা ‘[বিচারবহির্ভূত] জবানবন্দি,’ [ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নয়, এরূপ] দণ্ডাদেশের ভিত্তি হতে পারে কি না।
২. ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী গৃহীত সাক্ষীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা আইনত বৈধ কি না।
যুক্তিতর্ক :
আপীলকারী পক্ষের যুক্তি:
আপিলকারী পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া না যাওয়ায় বিচারিক আদালতের রায় সম্পূর্ণরূপে পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। উক্ত মামলায় এমন কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা নেই যা অভিযুক্তকে হত্যার সঙ্গে যুক্ত করে। তাজুল ইসলাম কর্তৃক জয়নাল আবেদীনের (PW-2) কাছে দেওয়া [বিচারবহির্ভূত] জবানবন্দি’ [ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নয় এরূপ], যেখানে তিনি আপিলকারী (নুরুল ইসলাম) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন, আইন অনুসারে হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করার ভিত্তি হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার অধীনে রেকর্ডকৃত সাক্ষীর জবানবন্দি শুধু সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারা অনুসারে জেরা করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, এবং এটি কোনোভাবেই দোষী সাব্যস্ত করার জন্য প্রধান/মূল প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এই যুক্তিগুলোর ভিত্তিতে তারা দাবি করেন যে, হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি:
রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, মূল আসামি তাজুল ইসলাম বিভিন্ন সাক্ষীর কাছে স্বীকার করেছে যে সে, তার স্ত্রী নূরজাহান, তার শ্যালক এবং নুরুল ইসলাম মিলে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। এছাড়া, সাক্ষী মনির হোসেনের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি আইনসম্মতভাবে রেকর্ড করা হয়েছিলো। এছাড়াও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত ব্যক্তির শরীরে বিভিন্ন ধরনের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিলো।
সিদ্ধান্ত :
আদালত বলেন, যখন কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ থাকে না, তখন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিগুলো অত্যন্ত সতর্কতা ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়। দোষী সাব্যস্ত করার জন্য পরিস্থিতিগুলির মধ্যে এমন একটি শৃঙ্খল বা সামঞ্জস্য থাকতে হবে যা অনিবার্যভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করে। কিন্তু এই মামলায় পরিস্থিতিগুলির মধ্যে কোনো শৃঙ্খল বা সামঞ্জস্য নেই। [বিচারবহির্ভূত] জবানবন্দি’ [ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নয়, এরূপ] অত্যন্ত দুর্বল প্রকৃতির প্রমাণ এবং এর আইনি গুরুত্ব খুব কম, যদি না স্বীকারোক্তির সময় আসামির ব্যবহৃত শব্দগুলি সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয় এবং অন্যান্য সহায়ক প্রমাণের মাধ্যমে তা নির্ভরযোগ্যভাবে সমর্থিত হয়। এ ধরনের সহায়ক প্রমাণের অনুপস্থিতিতে আদালত কোনো বিচার বহির্ভূত স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে রায় প্রদান করতে পারে না। এখানে তাজুল ইসলামের বিচারবহির্ভূত জবানবন্দি PW2 (জয়নাল আবেদীন) এর কাছে করা হলেও এর কোনো নির্ভরযোগ্য সহায়ক প্রমাণ নেই। তাই এর ভিত্তিতে নুরুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
ধারা ১৬৪ অনুযায়ী রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য সম্পর্কে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ওই বিবৃতি প্রদানকারী মনির হোসেনকে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য হাজির করা হয়নি। তবুও বিচারিক আদালত তার সম্পূর্ণ বিবৃতিকে গ্রহণ করেন এবং সেই ভিত্তিতেই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন, যা আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, মনির হোসেনকে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়নি, যদিও চার্জশিটে তাকে তালিকাভুক্ত সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে উপস্থাপন না করার ফলে সাক্ষ্য আইনের ধারা ১১৪(ছ) অনুযায়ী এমন একটি অনুমান সৃষ্টি হয় যে, তাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হলে তার বক্তব্য রাষ্ট্রপক্ষের সহায়ক হতো না।
সকল বিষয় বিবেচনাপূর্বক আদালত আপিল আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আপিলকারীকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। ফলশ্রুতিতে, বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করা হয় এবং আপিলকারীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট আইন :
- দণ্ডবিধি, ১৮৬০
- ধারা : ৩৪, ২০১, ৩০২
- সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২
- ধারা : ১১৪(ছ), ১৪৫
- ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
- ধারা : ১৬৪
অনুবাদক :
১. ফাহিম আহমেদ
[সতর্কতা : উক্ত মামলার বাংলা সংস্করণটি মূল ইংরেজি হতে অনূদিত। অর্থগত সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কোনো প্রকার অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হলে, মূল ইংরেজি সংস্করণ প্রাধান্য পাবে।]
নোট : The Case Summary আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনা ও রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই প্ল্যাটফর্মটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ আইনের ধারণা প্রদান করে না, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু মাত্র মামলার সারাংশ নির্ভর হওয়াকে নিরুৎসাহিত করি। ধন্যবাদ